বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৯
প্রথমপাতা > ক্যাম্পাস > ক্যাম্পাসে চড়ুইভাতি

ক্যাম্পাসে চড়ুইভাতি

শরিফুল ইসলাম সীমান্ত

হ্যাঁ আপনাকেই বলছি। চলুন না স্মৃতির ডায়েরিটা ঘেটে একটু পিছনে ফিরে যাই। সেই চিরচেনা গ্রাম, উচ্ছল শৈশব আর দুরন্ত কৈশোরে। বন্ধুদের সাথে ঝড়ের সময় আম কুড়ানোর প্রতিযোগিতা, পুকুরের ঘোলা জলে ননস্টপ গোসল করে চোখ লাল করে ফেলা, গোল্লাছুট, কাঁনামাছি, বউচি, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা ডাংগুলি। কতই না মজার ছিল সে দিনগুলি। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও সেই স্বর্ণালী স্মৃতিগুলো কিন্তু আজো মলিন হয়ে যায়নি। বরঞ্চ মনে পড়লেই একটা প্রশান্তির মৃদূ হাওয়া দোলা দিয়ে যায় মনে। সকালের নরম রোদের মত এক চিলতে মৃদূ হাসি খেলে যায় ঠোঁটের কোণায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চড়ুইভাতি করছেন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

শৈশব, কৈশোরের ফেলে আসা হাজারো মধুর স্মৃতির মধ্যে অন্যতম একটা স্থান দখল করে আছে পাড়ার বন্ধুরা মিলে ‘চড়ুইভাতি’ খেলা। স্থানভেদে যার আরেক নাম ‘জোলাভাতি’। এই চড়–ইভাতিতে চাঁদা হিসেবে সবাইকে যার যার বাড়ি থেকে নিয়ে আসত হত পরিমাণমত চাল ডাল। কারো কারো উপর দায়িত্ব থাকতো তেল আর মশলাপাতি যোগাড়ের। আবার কয়েকজন মিলে বেড়িয়ে পড়তো জ¦ালানী সংগ্রহে। বনে-বাদাড়ে ঘুরে কুড়িয়ে আনা হত গাছের নিচে পড়ে থাকা শুকনো পাতা আর চিকন ডাল। রান্না-বান্নার পর্বটা হতো সাধারণত খালের ধারে কিংবা খোলা প্রান্তরে বিস্তৃত ডালপালার বিশাল কোনো বটবৃক্ষের তলায়। বন্ধুদের মধ্যে বড় আপু শ্রেণির যারা থাকতেন দেখা যেত রান্না করার মত শৈল্পিক দায়িত্বটা তারা নিজ দায়িত্বেই কাঁধে তুলে নিতেন। বাকিরা মিলে মেতে উঠতো নানান খেলাধুলায়। রান্না হয়ে গেলে সবাই মিলে ঝাপিয়ে পড়তো খালের স্বচ্ছ পানিতে। অন্যদিন গোসল করতে দেরি হলেও তখন কার আগে কার গোসল শেষ হবে শুরু হয়ে যেত সেই প্রতিযোগিতা। গোসল শেষে শুকনো কাপড় পড়ে প্লেট হাতে বসে যেতো সবাই। বড় আপুরা একে একে ভাত তরকারি বেড়ে দিতেন। তারপর নিজেরা নিতেন। আপুরা যখন খাওয়া শুরুর ইঙ্গিত দিতেন তখন একসাথে শুরু হত খাওয়া। আহ! সে খাবারের কি স্বাদ। হলপ করে বলতে পারি এখনও সে স্বাদ আপনার মুখে লেগে আছে। মরার সময় আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় মৃত্যূর আগে আপনি কি খেতে চান আমি কিন্তু এ খাবারটাই খেতে চাইবো!

কিন্তু এখনতো অনেক বড় হয়ে গেছি। পড়াশোনা করছি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিশ্বমানের একটি ক্যাম্পাসে। চাইলেই তো আর সেই আবেগ অনুভ’তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই বলে কি আর বসে থাকা যায়? কথায় আছে ইচ্ছে থাকলে সবই স¤ভব। আর তাইতো আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা মিলে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিলাম ক্যাম্পাসে চড়–ইভাতি করার। তারপর দিন তারিখ ঠিক করে ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই উপস্থিত হলাম ক্যাম্পাসের ‘সুইজারল্যান্ডে’(মওলানা ভাসানী ও শহীদ রফিক জব্বার হলের দক্ষিণের সবুজ পাহাড়ি এলাকা)। রান্নার সময় আমাদের মধ্যে কয়েকজনের অজানা প্রতিভা নতুন রূপে উন্মোচিত হল। রাসেল, মুক্তি, শাহিন আর সানজিদা যে এত চমৎকার রান্না করতে পারে চড়–ইভাতি না হলে সেটা জানাই যেত না। হেনা, শিথীমা, শ্রাবণী আর নুঝহাতকে দেখা গেল সবজি কাটাকুটিতে বেশ পারদর্শী। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নাইমের কর্মব্যস্ততা আর অকপট কথাবার্তা ছিল আমাদের সবার জন্য এক কথায় চরম পর্যায়ের বিনোদন। সেতু আর সিফাতের ছেলেমানুষিও ছিল দেখার মত। এইরকম একটা আনন্দ আয়োজনকে ক্যামেরার ফ্রেমবন্দি করে রাখা হবে না ব্যাপারটা কিন্তু এই অতি আধুনিকতার যুগে একেবারেই বেমানান। তাইতো হিশাম আর মাইনুর ক্যামেরার শাটার টেপাটেপিতে অবশেষে সেটাও সম্পূর্ণ হল। রান্না শেষ হতে হতে দিন শেষে নেমে এলো সন্ধ্যা। সুইজারল্যান্ডের অন্ধকার আর শীতকালীন ঠা-া পরিবেশের চড়–ইভাতিতে অন্যরকম একটা আবহ তৈরির জন্য অপু আর রিফাত অনেক কাঠখড় আর কেরোসিন পুরিয়ে আয়োজন করলো ক্যাম্পফায়ারের। আগুনের চারপাশে গোল হয়ে দাড়িয়ে সবাই মিলে উচ্চস্বরে সঙ্গীত চর্চা হয়ে গেল বেশ কিছুক্ষণ। আমাদের সে গানের সুর প্রতিধ্বনিত হল সুইজারল্যান্ডের আকাশে বাতাসে। “….মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম/আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা….”। গানের কথাগুলো মনে হয় একটু চেঞ্জ করে নেয়া প্রয়োজন ছিল- এখন কি সুন্দর দিন কাটাচ্ছি আমরা/এখন কি সুন্দর দিন কাটাচ্ছি! তাই নয় কি?

ফেসবুক থেকে মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।