বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৯
প্রথমপাতা > কলাম > ‘অটিজম’ কোনো অভিশাপ নয়

‘অটিজম’ কোনো অভিশাপ নয়

অটিজম

আব্দুল্লাহ আল মাছুম

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর জন্ম কারো পাপের ফসল নয়। এই জন্মে না আছে জন্মদাতার অপরাধ, না আছে যে জন্ম নিলো তার অপরাধ। অথচ আমাদের সমাজে অটিজমে আক্রান্ত এসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্ম হওয়া মানে যেন জন্মদাতা বাবা-মায়ের বিরাট কোনো পাপের শাস্তির পরিণামে এই জন্ম। সৃষ্টিকর্তা যেন তাদের অপরাধকে মূর্ত করে পাঠিয়েছেন এই শিশুর দেহ দিয়ে। আর এই জন্মে অপরাধের শাস্তি শেষ হয়ে যায় না। বরং দ্বিগুণ কষ্ট নিয়ে হাজির হয়। এই কষ্ট শিশুটির বাবা-মায়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিও ভোগ করতে থাকে। অংশীদার হয়ে কিছুটা শাস্তি পায় কাছের অন্যান্য মানুষজনও।

একটি শিশু বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যখন আশেপাশের মানুষগুলোর কাছে স্পষ্ট হতে থাকে শিশুটি বাকি আট-দশটা শিশুর মতো নয় তখন বাতাসের বেগে এই খবর পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরা দলে দলে ভিড় জমায় বাড়ির আঙ্গিনায়। তারা আসে তবে শিশুটিকে কোলে নিয়ে একটু আদর করতে বা পরিবারটিকে অভয় দিতে নয়। তারা আসে একটু নাকটা উঁচু করে, ভ্রূটা কুঁচকে ইশারায় ইঙ্গিতে এ কথা বলতে ‘কোন …টাই না করছিল কে জানে। সৃষ্টিকর্তা তার প্রতিফল দেখালেন’।

সমাজের আশপাশের মানুষজনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যে অটিস্টিক শিশুটি প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আট-দশটা শিশুর মতোই শৈশবটা কাটাতে পারতো, মেলামেশায় কিছুটা হলেও আচরণে পরিবর্তন আসতো সেই শিশুটি ঘরবন্দি হয়ে থাকে। বিরূপ মন্তব্য শোনার ভয়ে পরিবারের সদস্যরাও চায় না তার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানটি জনসম্মুখে এসে কিছু একটা করে বসুক। দেখতে দেখতে বাড়তি সহানুভূতির বদলে বাড়তি অবহেলা নিয়ে শিশুটি বড় হয়। দিনদিন তার সমস্যা অবহেলায় আরো বাড়তে থাকে। নানা পাশ থেকে নানা কথা শুনতে শুনতে একসময় বাবা-মাও সন্তানটিকে আপদ ভাবতে থাকেন। ভাবতে থাকেন ‘একে দিয়ে আর কিছু হবে না’। গোপনে-প্রকাশ্যে চোখের পানি ফেলেন। একসময় নিজেরাও এই জন্মকে তাদের অপরাধের শাস্তি বলেই মেনে নেন। উপায় খুঁজেন এ শাস্তি থেকে পরিত্রাণের।

অথচ যদি আমাদের সমাজ আর দশটা রোগের মতোই ‘অটিজম’ শব্দটা ব্যবহার করত! যে রোগের পিছনে বস্তুত কারো হাত নেই, এ সহজ সত্যটা উপলব্ধি করত! যদি বাঁকা চোখে না তাকিয়ে শিশুটিকে স্বাভাবিক করার উপায় খুঁজতো! তাহলে খুব সহজেই শিশুটির শৈশব হাসি আনন্দে কেটে যেত। মানসিক কষ্ট থেকে বাঁচতেন বাবা-মা।

তখন বাবা-মা শিশুটিকে লুকিয়ে রাখার পথ না খুঁজে স্বাভাবিক জীবন উপহার দেওয়ার উপায় খুঁজতেন। কীভাবে চলতে হয় তা সহজে শিখাতে পারতেন। আগের চাইতে একটু ভালো জীবন উপহার দেওয়ার আশা জাগত তাদের মনে। অটিজম বিষয়টাকে আমাদের মন-মানসিকতা আরো জটিল করে তুলেছে। সমস্যাটাকে সমাধান না করে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অটিজম নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। আমরা যদি বুঝতে শিখি অটিজম কোনো অভিশাপ নয়। অভিশাপ আমাদের মনে বাসা বেঁধে থাকা ‘কুসংস্কার’। তাহলে অনেক কিছুরই এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হয়ে যাবে।

(৩০ জুলাই, ২০১৮ ইং তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের ৯ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত।)

লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,

সাভার, ঢাকা-১৩৪২

ফেসবুক থেকে মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।