বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৯
প্রথমপাতা > অন্যান্য > কেমন আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কেমন আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আব্দুল্লাহ আল মাছুম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে অধ্যয়নরত বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মনে করেন এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো গঠনমূলক সমালোচনা করতেও নারাজ। ক্যাম্পাসে কর্মরত কোনো সাংবাদিক যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তবে তারা সেই সাংবাদিকের উপরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। তাদের দাবি একটাই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সেরা। এই সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু অসংগতি থাকতেই পারে। তা বাইরের মানুষকে জানালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইমেজ’ নষ্ট হয়। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি-অসংগতির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও পাওয়া যায় না যতক্ষণ সংবাদপত্রে এই নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে। প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অংশ ‘ইমেজ’ নষ্ট হওয়ার অভিযোগ তুলেন। যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় কেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সেরা— তারা বলেন, জাহাঙ্গীরনগরের অপরূপ প্রকৃতি রয়েছে। আরেকটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলে তারা বলেন, ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম জাহাঙ্গীরনগরের। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যত সমস্যাই সামনে আসুক না কেন তাদের মূল কথা এরকমই।

শহীদ মিনার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কুখ্যাত র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করা যাবে না বা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছের পাতার মতো গাঁজা সহজলভ্য হওয়ার বিষয়েও কিছু বলা যাবে না। কারণ এতে বাইরের মানুষ জানবে। বাইরের মানুষ জানলে ‘ইমেজ’ নষ্ট হবে। বাইরের মানুষ না জানুক, অন্যদিকে তিলে তিলে আমার বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয়ে যাক। অথচ নিজের সমস্যার কথা, সীমাবদ্ধতার কথা যদি নিজেই না বলি তবে সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের সমবয়সী বিশ্ববিদ্যালয়টি দিন দিন মুখ থুবড়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নানা দলে বিভক্ত। এমনকি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী দাবি করা দুটি দল তৈরি হয়েছে। এ দুটি দলই সমান সক্রিয়। এসব শিক্ষকেরা আদর্শের জন্য নয় বরং নিজস্ব স্বার্থে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছেন। তারা বছরের বড় একটা সময় নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পিছনে ব্যয় করেন। একাডেমিক কার্যক্রমকে সহ-কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করেন। নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষা, গবেষণা সহ-কার্যক্রম হওয়ায় অবস্থা বেহাল হয়ে পড়ছে। বাড়ছে সেশনজট। সেশনজটসহ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পাঠদানে আরেক বড় বাধা সান্ধ্যকালীন কোর্স। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আজকাল আদর্শ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন না। তারা আদর্শ শ্রমজীবী বা ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। শুধু বাড়তি টাকার আশায় একের পর এক খোলা হচ্ছে সান্ধ্যকালীন কোর্স। সান্ধ্যকালীন কোর্সের শিক্ষার্থীদের মন জোগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন শিক্ষকেরা। নিয়মিত শিক্ষার্থীরা কেমন আছে সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজর না থাকায় নিজ বিভাগে নিয়মিত শিক্ষার্থীরাই এখন এতিম শিশুর মতো ঘুরে বেড়ায়। ঠিক সময়ে ক্লাস হোক বা না হোক, পরীক্ষা হোক বা না হোক, ফলাফল প্রকাশ হোক বা না হোক— এসব দিকে দেখার সময় শিক্ষকেরা পাচ্ছেন না। পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা দুর্দশার কারণ হতে পারে তার উদাহরণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পাওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের মতো অবকাঠামোগত নানা সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও গবেষণায় তেমন কোনো ফলপ্রসূ কার্যক্রম নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ আবাসিক হলে নেই গ্রন্থাগার বা পাঠাগার। আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং ও ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে রয়েছে প্রচুর ক্ষোভ। বটতলা ও আশ-পাশের খাবারের দোকানগুলোর বাহারি ভর্তার স্বাদের কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু বর্তমানে এসব ভর্তা বানানোর প্রক্রিয়া ও উপাদান দেখলে অনেক ক্ষেত্রে বমি আসার উপক্রম হয়। ময়লা-আবর্জনায় দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আশ-পাশের নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশও। দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসন ব্যর্থ। প্রশাসনের তদারকির অভাবে এরকম নানামুখী সমস্যা বাড়ছেই। একসময়ের সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টির সোনালী দিন হারিয়ে যাচ্ছে। যার পিছনের কারণ প্রশাসনের যোগ্যতার অভাব, উদাসীনতা, এবং লেজুড়বৃত্তি।

এই স্বল্প পরিসরে বিশ্ববিদ্যালয়টির সমস্যার কথা বলে শেষ করা যাবে না। মুখ থুবড়ে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে এখনই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সব দিক থেকে সংস্কার করা সময়ের দাবি।

০৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ইং তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের ৯ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,

সাভার, ঢাকা

ফেসবুক থেকে মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।