বুধবার, আগস্ট ২১, ২০১৯
প্রথমপাতা > ক্যাম্পাস > ছবি তুলতে ড্রোন শিক্ষা….

ছবি তুলতে ড্রোন শিক্ষা….

থেমে থেমে ঝিরি ঝিরি হাওয়া বইছে। বিদায়ী শীতের এই উঞ্চ সকালে সূর্যের মৃদু-মন্দ তাপ গায়ে খুব একটা লাগছে না। আর লাগলেও তাকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। তারা ভিড় করেছে নতুন কলা (কলা ও মানবিকী অনুষদ) ভবনের ছাদে। ছোট্ট একটি যন্ত্রকে ঘিরে উৎসুক ও অনিসন্ধিৎসু শিক্ষার্থীদের এ জমায়েত। তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক জনাব উজ্জ্বল কুমার মণ্ডল, সহকারী অধ্যাপক জনাব সালমা আহমেদ ও অতিথি শিক্ষক জনাব কাজী রওনক জাহান।
ফটো সাংবাদিকতা কোর্সের ক্লাস অথচ ফটো তোলা হবে সে তো আর হয়না! তাছাড়া এমন ঐতিহাসিক মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দি করতে হবেনা? যেই ভাবনা সেই কাজ! যন্ত্রটিকে ঘিরে চলছে ক্লিক, ক্লিক..ক্লিক!
কোর্স শিক্ষক সালমা আহমেদ এবার রহস্যটি উন্মোচন করে জানালেন, “তোমরাই বিভাগটির প্রথম ব্যাচ (৪৪ তম আবর্তন) যারা কিনা ফটোগ্রাফিতে ড্রোনের ব্যবহার শেখার দুর্লভ সুযোগটি পাচ্ছো।” শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে চাপা উচ্ছ্বাস যেন দ্রুতই বির লাভ করলো।শেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষাদানের এ প্রয়াসটি শিক্ষার্থীদের ফটোগ্রাফি ও সাংবাদিকতা সংক্রান্ত নতুন ধারণা প্রদান করবে- বলে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
সভাপতি উজ্জ্বল কুমার মন্ডল বলেন, “প্রযুক্তি নির্ভও বিশ্বব্যবস্থায় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও প্রাযুক্তিক পরিবর্তন এসেছে। ‘ড্রোন সাংবাদিকতা’ নামে সাংবাদিকতায় নতুন একটি ক্ষেত্রই তৈরী হয়েছে। যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়াটা তাই অতীব জরুরী।”
ড্রোনের মাধ্যমে সংবাদ সংগ্রহ করাটা সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত। যেখানে মানুষের সীমাবদ্ধতা সেখানে এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো যেতে পারে- বলে জানালেন কোর্সটির অতিথি শিক্ষক কাজী রওনক জাহান। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার করা গেলে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রটি আরো বিকশিত হতো। রানা প্লাজার মতো ঘটনার ভয়বহতা সর্ম্পকে দ্রুতই জানা সম্ভব হতো।
নড়ে চড়ে ওঠলো ছোট্ট ড্রোনটি। চারপাশের ৪টি ডানা মেলে দিয়েছে সে। সাথে সাথে সবিস্ময়ে জ্বলে উঠলো প্রত্যেকের চোখ। ক্যামেরা হাতে প্রস্তুত সবাই। একটু উপরে উঠতেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেল উড়ন্ত ড্রোনটিকে ফ্রেমেবন্দি করবার ব্যস্ততা। তবে ড্রোন কিন্তু সেসব আত্মপত্যয়ী ক্যামেরাম্যানের ছবি তুলতে মোটেও ভুল করেনি। সে নিজেও তার গুনগ্রাহীদের ছবি তুলে নিয়েছে। ছবি তোলার কাজটি ড্রোন যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করেছে, তা কিন্তু নয়। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে হাতে থাকা বিশেষ যন্ত্রটির সাহায্যে ড্রোনটি নিয়ন্ত্রন করছিলেন কাজী রিসালাত হোসেন।
তিনি বলেন ড্রোনের নিয়ন্ত্রন করাটা খুব বেশি কঠিন কিছু নয়। অনেকটা খেলনা উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ করার মতো বিষয়টা। উৎসুক শিক্ষার্থীরা এবার নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন তাকে। তিনিও গুছিয়ে জবাব দিতে দিতে বাতাসে ভাসালেন ড্রোনটিকে। তার ভাষ্যমতে, ব্যবহৃত ড্রোনটি ৩টি ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি তুলতে পারে, কার্যক্ষমতা অনুযায়ী এটি ৫০০ পর্যন্ত মিটার উপওে উঠতে পারে এবং এটিকে সর্বোচ্চ ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরে পাঠিয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণ করা যায়। তবে দৃষ্টিসীমার মধ্যেই এটিকে রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সাথে থাকা মোবাইল স্ক্রিনেই দেখা ড্রোনটি তার ক্যামেরার চোখে কি দেখছে আরকি দেখছে না। সেটি দেখেই নিয়ন্ত্রনকারী যথাযথ ফ্রেম নির্ধারণ করে ছবি বা ভিডিও চিত্র ধারণ করেন। ড্রোনটিকে এবার আমাদের ছবি তোলার নির্দেশনা দিলেন নিয়ন্ত্রণকারী। সাঁই সাঁই করে আমাদের মাথার উপরে উড়ে এলো ড্রোনটি। আমরা হাসি হাসি মুখ নিয়ে তার দিকে চেয়ে রইলাম। নিয়ন্ত্রণকারীর ইশারায় ড্রোনটি তুলতে লাগলো আমাদের বিস্মিত মুখের ছবি। ক্লিক করতে করতে আরো উপরের দিকে উঠতে লাগলো ড্রোনটি। তার নিচে নামার আগেই ড্রোন বিষয়ক সামান্য কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক, চলুন!
সাংবাদিকতা কিংবা ফটোগ্রাফির কাজে ড্রোনের ব্যবহার খুব বেশি দিনের নয়। উইকিপিডিয়া বলছে, ২০১৩ সালের অক্টোবরে বিবিসি’ই প্রথম ড্রোন জার্নালিজমের সূচনা ঘটায়। বর্তমানে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী সংবাদ মিডিয়াতে ড্রোনের ব্যবহার ও কার্যকারিতার দিকটি গবেষণাধীন রয়েছে। ইন্সটিটিউট ফর স্টাডি অব জার্নালিজম জানায়, সংবাদ সংগ্রহের ঝুঁকি কমিয়ে সংবাদ সংগ্রহে ব্যবহার করা যেতে পারে ড্রোন প্রযুক্তিটি। তবে সাংবাদিকতা, ফটোগ্রাফি ছাড়াও ড্রোনের বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ভয়াবহ ব্যবহারের কথা সকলেরই জানা। তাই ইতিবাচক ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে ইচ্ছা করলেই যে কেউ ড্রোন ব্যবহার করতে পারেনা। ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে। এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের, পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অনুমতির প্রয়োজন হয়।
ক্লান্ত ড্রোনটি নেমে এসেছে। ১৫ থেকে ১৭ মিনিটেই এর ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় চার্জ ফুরাবার আগেই এটি নিজ থেকেই সিগনাল পাঠায় যাতে নিচে ফেরত আসবার মতো শক্তি সঞ্চিত থাকে ব্যাটারিতে। পরিবর্তন করে অন্য আরেকটি ব্যাটারি লাগানো হলো ড্রোনটিতে। উদ্দেশ্য এবার জাহাঙ্গীরনগরের প্রকৃতি ও পরিবেশের ছবি তোলা। ড্রোনটি প্রথম দিকে অনায়াসে ছবি তুলতে পারলেও পরের দিকে তাকে বাধ্য হয়ে নামাতে হয়। একটি চিল তার উড্ডয়ন সীমায় ড্রোনটিকে ঢুকতে দেখে বেশ অবাকই হয়। ড্রোনটির আশে পাশে ঘুরঘুর করতে থাকে। মুখোমুখি হয় প্রকৃতি বনাম মানবসৃষ্ট কৃত্তিম যন্ত্র। প্রকৃতির শক্তির কাছে হার মেনে নেমে আসতে বাধ্য হয় কৃত্রিম যন্ত্রটি।
ইতি ঘটাতে হলো মিথস্ক্রিয়ামূলক একটি উনুক্ত ক্লাসের। প্রযুক্তি আর ফটোগ্রাফির নতুন কলাকৌশলকে ধারণ কওে শিক্ষার্থীরা ফেরার পথ ধরলো। চোখে-মুখে তাদের কৃতজ্ঞতা আর নতুন কিছু শিখতে পারার মতো প্রশান্তির স্পষ্ট ছাপ।হঠাৎ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে আওয়াজ এলো, আমরাও এখন ড্রোন চালাতে জানি!

লেখক: আল-আমীন,  শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।