বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৯
প্রথমপাতা > অন্যান্য > বসন্ত এসে গেছে…

বসন্ত এসে গেছে…

আল আমীন*
প্রকৃতিতে এখন শীতের রুক্ষতা কিংবা রিক্ততার কোন ছাপ নেই । বরং বৃক্ষের নগ্নশাখাকে ভরিয়ে তুলেছে নরম কচিপাতার দল। নবীন পত্রদলকে জায়গা করে দিতেই যেন প্রবীণরা সব ঝড়ে পড়েছিল শীতের শুষ্কতায়। নিষ্কলুষ কচিপাতায় রৌদ্র-ছায়ার রঙ্গীন খেলা চোখকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুলছে। খানিক বিরতিতে বয়ে চলা ঝিরঝিওে মাতাল হাওয়া শুধু প্রকৃতিতে নয়, হৃদয়েও দোলা দিয়ে যাচ্ছে। বাতাসের মৃদু-মন্দ ঝাপসা মনকে উদাস করে দেয়। মূহুর্তেই ক্ষণিকের বাস্তবতাকে বহু দূরে ঠেলে দিয়ে হৃদয়ে কাঁপন তুলছে উদাসী এ হাওয়া। এখানে-ওখানে ফুটে থাকা বাহারি ফুলের রঙরাঙাতে চায় মনকেও, জাগাতে চায় হৃদয়পটে সুগোপনে লুকিয়ে থাকা ঘুমন্ত কোন কোন স্মৃতিশহরকে। মন যেন সহসাই বলে উঠে, “তবে কি বসন্ত এসেই গেল?”

হ্যাঁ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত এসে গেছে। পথের ধারে চেয়ে দেখুন শুকনো পাতায় পথ ঢেকে গেছে। দমকা বাতাসে মধুর এক ছন্দ মিলিয়ে গাছ থেকে এখনো ঝরে পড়ছে আরও আয়ুষ্মান কিছুপ্রবীণ-পল্লব। অনায়াসে তারা মিশে যাচ্ছে পথের ধূলোয়। হঠাৎই মচমচ আওয়াজ, ভয় পাবেন না। শুকনো পাতায় আপনার পা পড়েছে নিশ্চয়! চেয়ে দেখুন না, মাঠের ঘাসগুলো কেমন তামাটে বর্ণ ঝেড়ে ধীরে ধীরে লক্ষ্যনীয় সবুজ রঙ ধারণ করছে।

প্রাণভরে শ্বাস নিন। দেখুন তো মিষ্টি কোন সুবাস পাচ্ছেন কিনা? না, গন্ধটা বন্ধুর বাড়ির ফুলের নয়। এখানে বন্ধুর হল বলাটাই যুক্তিযুক্ত। গানের শব্দটাকে একটু এদিক সেদিক করে নিলে নিলে ক্ষতি কি বলুন? চেয়ে দেখুন এই ফাগুনে শিমুল-পলাশের ডালে ডালে কেমন লাল রঙ্গের আগুন লেগেছে। মনে হবে দুরন্ত শিমুল আর পলাশ দূর থেকেও আপনাকে তার কাছে ডাকছে। আপনি এখনো পাখিদের বসন্ত-বন্দনা শোনেন নি? তাহলে কোলাহল ঢেকে কান পাতুন। শুনলেন তো, প্রকৃতির এত রূপ লাবণ্য দেখে পাখিরা কেমন মনের সুখে গান ধরেছে। এবার তো বিশ্বাস হলো যে, বসন্ত আপনার দুয়ারে দাঁড়িয়ে?

“বিশ্বাস করি আর না করি, যেদিন ললনাদের মাঝে ক্ষণিকের বাঙ্গালী সাজে সাজতে দেখলাম, সাথে মাথায়-মাথায় ফুল ফুটতে দেখলাম সেদিনই বুঝেছি বসন্ত চলে এসছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি।” বসন্তের আগমণী বৈশিষ্ঠ্য সম্পর্কে কথাগুলো বলছিলেন সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মল্লিক কুমার বিশ্বাস।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৃতির অপূর্ব ভান্ডার। প্রতিটি ঋতুতে যাররূপের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। যেকোন ঋতুতে অপরূপ হয়ে ওঠে এ সবুজ চত্ত্বরটি। প্রকৃতি প্রেমিকদের মধ্যে এর অপরূপ সৌন্দর্য যে কত রকমের অনুভূতির জোয়ারে ভাসায় তা একমাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পর্কিত মানুষগুলো ভালো বলতে পারবেন। সম্ভবত তাদের মধ্যে বসন্তই সবচেয়ে প্রাচুর্যতা প্রদানকারী ঋতু।

“আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুলফুটে,
এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়..”
বসন্তের বিশেষত্বই তো ফুল। নানা রঙ আর বর্ণের ফুলেফুলে ছেয়ে গেছে পুরো ক্যাম্পাস। কোনটা চেনা, আবার কোনটা অচেনা ফুল। পথের ধারের ছোট্টঘাস থেকে শুরু করে পলাশ-শিমুলের মস্ত ডালে ডালে বাহারী ফুল তাদের সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। মুগ্ধ পথিকের চোখ জুড়াতেই যেন তাদের এই অক্লান্ত প্রচেষ্টা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারের রঙিন ফুলের দল আপনাকে সাদরে বরণ করে নিতে সদা প্রস্তুত। নান্দনিক প্রবেশদ্বারটির সম্মুখে ঢাল বেয়ে নেমে চলা ফুলগাছগুলো শুধু বাহারি রঙ ছড়িয়ে মুগ্ধই করছে না, বসন্তের আগমনি বার্তারও জানান দিচ্ছে।
প্রবেশদ্বার পেরোলেই শহীদ মিনার অভিমুখী প্রধান সড়কটির দুপাশে গাছগুলোতে কচি-সবুজের আধিপত্য বেশ ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায়। মনে হয় সবগুলো গাছই যেন নব জীবন লাভ করেছে। বৃক্ষসারির মাঝে থাকা পলাশের ডালগুলো পথের মধ্যে রঙ্গিন ফুল বিছিয়ে দিতে মোটেও কার্পণ্য বোধ করেনি। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে প্রকৃতি যেন খুশির আমেজকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আনন্দে কোকিল গেয়ে উঠছে বার বার। পাখির কূজনে আর দিকে দিকে উপচে পড়া সৌন্দর্যে আপনার মনে হতেই পারে যেন প্রকৃতির কোন স্বর্গরাজ্যে বিচরণ করছেন। স্বর্গরাজ্যটিতে প্রিয় মানুষটির হাতে হাত রেখে বসন্ত উপভোগের বাসনা যে কারোই জাগতে পারে। প্রকৃতি মানুষকে প্রেমিক হতে শেখায়। রঙীন বসন্ত একটু বেশিই রঙ বিলায় সম্ভবত।

বিকালের সোনা-ঝড়া রোদে কেন্দ্রীয় মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে শিমুলের গাছে দিকে চেয়ে দেখেছেন কখনো? কিংবা দুপুরের খানিকটা কর্কশ রোদে ছবি চত্ত্বর সংলগ্ন পলাশের ডালে পাখিদের মধুপানকরার দৃশ্য দেখেছেন? তাহলে হয়তো খানিকটা বুঝতে পারতেন যে বসন্ত কতটা লাবণ্যময়। জাহাঙ্গীরনগরের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিতে তারও চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ বসন্ত ঋতুর প্রভাব বর্ণনা করে শেষ করাটা সহজ নয়।

“প্রকৃতির এ স্বর্গ রাজ্যের রূপ-লাবণ্যকে ধরে রাখতে আমাদেরই কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে যাতে উন্নয়ন প্রকল্পের স্থাপনাসমূহ নির্মাণ না করা হয় সে বিষয়ে প্রসাশনকে ভূমিকা রাখতে হবে। সেটি না করা হলে আগামী বসন্তগুলো হয়তো ক্যালেন্ডারের পাতা দেখেই নিশ্চিত হতে হবে।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানাচ্ছিলেন তার মতামত। তারই আশাবাদ “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী বসন্তগুলো আরও রঙিন হবে তো।”

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।