বুধবার, আগস্ট ২১, ২০১৯

অধীশ্বরী

নদীর পাড়, তার সাথে জ্যোৎস্না। মনে হচ্ছে অন্য গ্রহে আছি। চারিদিকে কেমন পরজাগতিক রোশনাই। আমারতো নেশা লেগে যাচ্ছে। সিগারেটের ধোঁয়াও আমার সাথে কল্পনার প্রলেপ আঁকা প্রকৃতি উপভোগ করছে।

নানাবাড়ি আসা হলো প্রায় ১২ বছর পর। ভালই লাগছে। শেষ বার এসেছিলাম নানা গত হবার পর। আর এলাম এই ইদে। আত্মীয়স্বজন আছেন গ্রামে অনেকেই। বাট শহর পোকারা গ্রামে এসে কুলোতে পারেনা।

বসে আছি, রাত আটটার মত। একাই বেশ। ফোনে চার্জ নেই, ইলেট্রিসিটিও নেই। যাই হোক ব্যপার না। ফোন নিয়ে এখন আর মাথা ঘামাই না। অধীশ্বরী মিলিয়ে গেছে যে। সময় কি হঠাৎ থমকে গেছে, বুজতে পারছি না কেন। কি ব্যপার এখনও দেখছি আটটাই বেজে আছে। ঘড়িটা কি নস্ট হয়ে গেল।

বসে ছিলাম কিছুটা নিচে। নদীর পাড় ঢালু হয়ে জল ছুঁয়ে গেছে। সব কিছু কেমন ঘোলাটে লাগছে। আমি পাত্তা দিলাম না। মনে হচ্ছে ফিরে যাওয়া চলে এবার। হাঁটা শুরু করলাম। কেউ কি আসছে। জোৎসনার আলো কিছু একটার আবছায়া দেখাচ্ছে আমায়। একজন মানুষ। মহিলা এগিয়ে আসছেন পাড়ের দিকে। আমি হাঁটা থামালাম। এত রাতে কি চান উনি। কি করবেন। অনেকটা এগিয়ে এসেছেন। লাল আর গোলাপীর মাঝামাঝি রেশমি শাড়ি। পুর্নিমার মতো গায়ের রঙ। চারদিকের সাথে মিশে গেছে। আমার চোখ আলাদা করতে পারছে না। উনি কাছে চলে এসেছেন। পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। না, মুখ দেখা যাচ্ছে না। আঙুল দেখতে পাচ্ছি হাতের। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড় এটুকু বলতে পারব। উনি হেঁটে চলেছেন। জলের কাছাকাছি। নামবেন কি? কয়েক মুহূর্ত দাঁড়ালেন। হ্যাঁ, উনি নামছেন জলে। কেন? এত রাতে গোসল? না, হিসাব মিলছে না। উনি ডুব দিলেন। সব দেখতে পাচ্ছি। জোৎসনা আরো তীব্র হয়ে গেছে। দিনের আলোর মতো স্পষ্ট সব।

কতক্ষন ডুব দিয়ে থাকবেন? সময় দৌড়ে যাচ্ছে। ওঠার কোন নাম নেই। আমি কি চলে যাব? নাহ এ মুহূর্তে তা সম্ভব নয়। স্থির দাঁড়িয়ে আছি। ওইতো, ওইতো উনি উঠেছেন। চুলগুলো মুখের সাথে একদম লেপ্টে আছে। চেহারা কি রকম ওনার? উঠে আসছেন। আমি দাঁড়িয়েই আছি। অন্তকাল কেটে যাচ্ছে। উনি এগিয়ে আসছেন। খুব স্বাভাবিকভাবে। ভেজা শরীর থেকে জল পড়ছে। কিন্তু ওনার পা দেখতে পাচ্ছিনা। চোখের ভুল নাকি। উনি কাছাকাছি চলে এলেন একদম। ভয়ংকর অসস্তি হচ্ছে। আসছেন আসছেন আসছেন। আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। আমার কানের কাছে মুখ নিলেন। একবিন্দুও নড়তে পারলাম না। কিছু বলবেন কি উনি? “কেউ নিল না আমায়” নারী আর পুরুষালি মেশানো গলায় উনি এই টুকু বলে উঠলেন। এরকম কন্ঠ কখনো শুনবো স্বপ্নেও ভাবিনি।

উনি মুখ সরিয়ে সামনে আনলেন। আমি এই প্রথম ওনার মুখ দেখার সুযোগ পেলাম। আর ওই দৃশ্য আমাকে জেগে দেখে দু:স্বপ্ন দেখিয়ে দিল। শুধু অবয়ব, নাক-মুখ-চোখ সবই অনুপস্থিত, অসমাপ্ত জ্যামিতির মতো। আমার দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নি:শেষ হয়ে এল। চিৎকার দেয়ার কথা মাথায় এলেও মুখ পর্যন্ত আনার শক্তি নেই। ঝাপসা চোখে দেখলাম নারীমুর্তিটি আমাকে ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি। শুধু দেখার ক্ষমতাটুকুই টিকে আছে। আমি কি এখনো দাঁড়িয়ে আছি?

কত সময় কেটে গেছে বলতে পারছি না। শুধু মনে আছে কয়েকজন ধরে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন বিছানায় শুয়ে আছি। মা কোথায়? খালাম্মা নামাজ পড়ছেন। তুই নদীর পাড়ে কি করছিলি? জনৈক কাজিনের প্রশ্ন আমি ইঙ্গিতে বুঝালাম সিগারেট খেতে। অজ্ঞান হলি কি করে? পরে বলি। যা বলব তা তো বিশ্বাসযোগ্য না। কি লাভ বলে।

ঘুম ভাঙ্গল বিকেলে। মাথা ধরে আছে। কোন রকমে উঠে বাইরে পা রাখলাম। কাজিন রফিক দেখে এগিয়ে এল। এখন কেমন? এইত চল হেঁটে আসি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির আঙ্গিনা ছেড়ে বড় রাস্তায় এলাম। কি হইছিল বলতো এক মহিলাকে দেখছি কোথায় ওই যে নদীর পাড়েকে? জানিনা। আমাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে নদীতে ডুব দিল। উঠে এসে আমার কানে কিছু একটা বলল। মহিলার মুখের কোন অবয়ব নেই। কি??!!!

হুম রফিকের মুখ দিয়ে কথা সরল না। তবে সে মনে হয় বুঝতে পেরেছে। কথায় কথায় বলল গ্রামে কয়েক মাস আগে এক স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা জলে ডুবে মারা গেছিল। গ্রামে আরো কয়েকজন একটা নারী ছায়ামূর্তি দেখেছে। কিন্তু কোন কথা কেউ শোনেনি। আমি আর মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতে পারলাম না। মাথার ভেতরে কেমন দুর্বল লাগছে। ওকে বলে বাড়ির পথ ধরলাম।

এর দুইদিন পর ছিল ইদ। ইদ শেষে মাকে নিয়ে ঢাকা ফিরে এলাম। মাকে বলিনি এসব উদ্ভট কথা। সাইক্রিটিস্ট এর সাথে কনস্যাল্ট করলাম। বলল আপনি মে বী ট্রমা থেকে এসব দেখেছেন। ব্রেক-আপের স্মৃতি আপনাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। রিলাক্সে থাকুন। আনন্দে থাকুন। ভাল হয়ে যাবেন। ৩ বছর হয়ে গেল। কবে আর ট্রমা কাটবে, আর কাটবে না।

কনস্যাল্ট শেষে বেরিয়েছি, বাসায় যাব। গলির মাথায় রিক্সা থামাতে হলো। বিদ্যুৎ চলে গেছে। বাসার দিকে এগুচ্ছি। আজও তো মনে হচ্ছে জোৎসনা। বাসার সামনে কেউ কি দাঁড়িয়ে? আমি ভয় পেলাম। কে?? পকেটে মোবাইল কেঁপে উঠলো। ঠিক আটটা। একটা মেসেজ। কে পাঠালো? কোন নাম্বার নেই কেন? কি লেখা? “কেউ নিলনা আমায়” আমি মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললাম। বাসার সামনের ছায়ামূর্তি আমার দিকে এগিয়ে এল। সামনে এসে আমার দিকে তাকালো। না কিছু বলল না। তবে চেহারা দেখলাম। হ্যা সেই আগের মতো অবয়বহীন। শুধু কাঠামো। আমি ঝিমিয়ে পড়তে লাগলাম। পরদিন সকালে খবর এল। সীমা, আমার হারিয়ে যাওয়া অধীশ্বরী সুইসাইড করেছে, স্বামী-শ্বশুর বাড়ীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে। আমি নির্বিকার শুয়ে আছি। আমার কানে অশরীরী ঘুম পাড়া নিগান বাজছে। “কেউ নিল না আমায়” “কেউ নিল না আমায়”

লেখক: অনুপ মালাকার, শিক্ষার্থী, ৪১তম আবর্তন, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।